মোবাইল ফোনের দাম আগেই বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা

এনবিআরের শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত কাজে আসবে কি

সাধারণ মানুষের নিত্য অনুষঙ্গ হয়ে ওঠা মোবাইল হ্যান্ডসেটের দাম নাগালের মধ্যে রাখতে আমদানীকৃত ফোনের ওপর শুল্ক কমিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

সাধারণ মানুষের নিত্য অনুষঙ্গ হয়ে ওঠা মোবাইল হ্যান্ডসেটের দাম নাগালের মধ্যে রাখতে আমদানীকৃত ফোনের ওপর শুল্ক কমিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এর মধ্যে মোবাইল ফোন আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে মোবাইল ফোন সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উপকরণ আমদানির শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ শতাংশে।

এনবিআরের পক্ষ থেকে শুল্ক কমানোর প্রজ্ঞাপন জারির আগেই অবশ্য মোবাইল ফোনের দাম ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা। চলতি বছরের শুরুর দিন থেকেই ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালুর পর দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়। নতুন করে শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত মোবাইল ফোনের দাম কমাতে আদৌ কতটা ভূমিকা রাখবে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এনইআইআর চালু, কৃত্রিম সংকট তৈরি ও এনবিআরের কড়াকড়ির কারণে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছেন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বিএম মইনুল হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কোন চিন্তা থেকে সরকার কী উদ্যোগ নিচ্ছে সেটা মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। কারণ মানুষ পণ্য কেনে তার আর্থিক সুবিধা অনুযায়ী।’

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় গত ১ জানুয়ারি থেকে অবৈধ ও ক্লোন মোবাইল হ্যান্ডসেট বন্ধ করতে এনইআইআর সিস্টেম চালু করেছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। এর প্রতিবাদে বিটিআরসি ভাংচুর, মানববন্ধন, সড়ক আটকিয়ে আন্দোলন করেন আনঅফিশিয়াল মোবাইল হ্যান্ডসেট বিক্রি করা ব্যবসায়ীরা। এর পর থেকেই মোবাইল ফোনের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা করেন গ্রাহকরা। এছাড়া ২০২৫ থেকে বৈশ্বিক বাজারে মেমোরি চিপের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যবৃদ্ধির কথা আগেই জানান ব্যবসায়ীরা। তবে সরকার বলেছিল এনইআইআর চালু করায় দাম বাড়বে না। এর জন্য মোবাইল ফোন আমদানিতে মোট কর ৬১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪৩ দশমিক ৪ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয়া হয়।

এনবিআর গতকাল মোবাইল আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে আনার প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, শুল্ক কমানোর ফলে ৩০ হাজার টাকার বেশি দামের প্রতিটি আমদানীকৃত মোবাইল ফোনের দাম আনুমানিক সাড়ে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। আমদানিতে শুল্ক কমানোর পাশাপাশি দেশীয় মোবাইল ফোন সংযোজন শিল্পকে সুরক্ষা দিতে পৃথক আরেকটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে এনবিআর। এতে মোবাইল ফোন সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উপকরণ আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

এনবিআর বলছে, শুল্ক কমানোর ফলে দেশে সংযোজিত ৩০ হাজার টাকার বেশি দামের প্রতিটি মোবাইল ফোনের দাম আনুমানিক দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত কমবে। আমদানি ও সংযোজন উপকরণে উল্লেখযোগ্য শুল্ক ছাড়ের ফলে সব ধরনের মোবাইল ফোনের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে বলে মনে করে এনবিআর।

যদিও বছরের শুরুর দিন থেকে মোবাইল ফোনের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। স্মার্টফোন ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন ব্র্যান্ড প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মডেলভেদে প্রায় সব ফোনেরই দাম বেড়েছে ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।

গ্রাহকরা বলছেন, এনইআইআর চালুর পরই মোবাইলের দাম বেড়েছে। মাহবুব আলম নামের এক গ্রাহক সম্প্রতি রেডমি ১৫ (৮/২৫৬) সিরিজের একটি মোবাইল ফোন কিনেছেন ২২ হাজার ৯৯৯ টাকায়। তিনি বলেন, ‘ডিসেম্বরে অনলাইনে এ ফোনের দাম দেখেছিলাম ২০ হাজার ৯৯৯ টাকা। কিন্তু জানুয়ারিতে গিয়ে দেখি ২৩ হাজার টাকা। কারণ জানতে চাইলে বিক্রেতারা বললেন, বাজারে মোবাইলের সংকট। ব্র্যান্ডের ফোন এখন থেকে নাকি বেশি দামে কিনতে হবে। সরকার এত উদ্যোগ নিল তাহলে গ্রাহক কী সুবিধা পেল?’

আমদানি হওয়া ফোনের পাশাপাশি দেশে উৎপাদিত প্রায় সব ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোনেরই দাম বেড়েছে। বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বছরের শুরু থেকে মোবাইলের দাম বেড়েছে। এনইআইআর চালুকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীদের একটি পক্ষ দোকান বন্ধ রাখছে, আরকেটি পক্ষ দাম বাড়াচ্ছে। মাঝে বেকায়দায় পড়ছেন গ্রাহকরা। আজকে (গতকাল) সরকার বলছে আমদানি শুল্ক কমানো হয়েছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা তো আগেই দাম বাড়িয়ে ফেলেছেন। এখন শুল্ক কমালে দাম কমবে কিনা। ব্যবসায়ীরা বলছেন বৈশ্বিক বাজারে মেমোরি চিপের দাম বাড়ায় মোবাইলের দাম বেড়েছে। অনেক ফোন তো দেশেই উৎপাদন হয়। সেগুলোর দাম কেন বাড়ল? মোবাইল অ্যাকসেসরিজ দেশে উৎপাদন করে নিজেদের ম্যানুফ্যাকচার দাবি করে। তাহলে বৈশ্বিক চাপ কেন এখানে পড়বে? ডিউটি ফ্রি করে তাহলে কার লাভ হবে?’

অফিশিয়াল ফোন বিক্রেতারা অবশ্য বলছেন, মোবাইলের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ বৈশ্বিক বাজারে মেমোরি চিপের দাম বেড়ে যাওয়া। আরেকটি কারণ অনির্দিষ্টকালের জন্য আন-অফিশিয়াল ফোনের দোকান বন্ধ থাকা। এ সুযোগে ব্র্যান্ডগুলো অধিক মুনাফার আশায় দাম বাড়াচ্ছে। এখন শুল্ক কমানোর কারণে বাজারে দাম কমে যাবে।

অন্যদিকে বসুন্ধরা ও গুলশানের কয়েকটি অফিশিয়াল ফোনের দোকানের কর্মরতরা স্বীকার করেন, মোবাইল ফোনের দাম বাড়ার পেছনে এনইআইআরের একটা ভূমিকা আছে। এখন একটা সংকট চলছে। ডিসেম্বরের শুরু থেকে ব্র্যান্ডগুলো খুচরা পর্যায়ে ফোন দেয়নি। তারা নতুন বছরের আগেই দাম বাড়ার মূল্য তালিকা খুচরা পর্যায়ে পাঠিয়েছে।

মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওবি) নির্বাহী পরিচালক মনিরুল বশির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জানুয়ারির শুরু থেকে মোবাইলের দাম বাড়বে সেটি আগে থেকেই জানা ছিল। মূলত বৈশ্বিক বাজারে মেমোরি চিপের দাম বাড়ার কারণে এমনটা হয়েছে। এআই কোম্পানিগুলো বেশির ভাগ মেমোরি চিপ রেখে দিয়েছে, সেটার প্রভাব পড়ছে দেশীয় বাজারে।’

তবে এখানে ব্র্যান্ডগুলোর কারসাজি রয়েছে বলে মনে করেন মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশের (এমবিসিবি) ভাইস প্রেসিডেন্ট শামীম মোল্লা। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এনইআইআর চালুর আগেই বলেছি দাম বাড়বে। কারণ বাজারে আমরাই সবচেয়ে বেশি মোবাইল সরবরাহ করি। সরকার এনইআইআর করেছে মূলত ব্র্যান্ডগুলোর জন্য। এখন এনবিআর ডিউটি কমাল। কিন্তু তার আগেই ব্র্যান্ডগুলো দাম বাড়িয়েছে। তাহলে বাজারে তার কী প্রভাব পড়বে?’

এ বিষয়ে জানতে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারীকে একাধিকবার কল করেও পাওয়া যায়নি।

আরও